সরকারি চুক্তির আওতায় সাড়ে চার লাখের বেশি কর্মী পাঠানোর পর বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট, মানিলন্ডারিং ও মানব পাচারের অভিযোগ ওঠে। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের চারটি তদন্তেই অভিযোগ অপ্রমাণিত হলেও থামছে না হয়রানি, ঝুঁকিতে দেশের ৪র্থ বৃহত্তম রেমিট্যান্স উৎস।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MOU) ও সরকার-থেকে-সরকার প্লাস (G2G Plus) কর্মসূচির অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ৪ লাখ ৭২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী আইনসম্মতভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এই সফল মানবসম্পদ রপ্তানির সূচনাপর্বেই বৈধ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গঠন, মানিলন্ডারিং ও মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এরপর গত ছয় বছর ধরে একই অভিযোগ নিয়ে চলছে নানামুখী আইনি হয়রানি, যার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে দেশের বৈধ রিক্রুটিং খাত।
৪.৭২ লাখ+
MOU ও G2G Plus-এ প্রেরিত কর্মী
৪টি
স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা (MACC, দুদক, সিআইডি, ডিবি)
৪র্থ
রেমিট্যান্স উৎস হিসেবে মালয়েশিয়ার অবস্থান (২০২৪-২৫)
MOU ও G2G Plus চুক্তির প্রেক্ষাপট
মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক MOU অনুযায়ী কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের তালিকাভুক্ত এই এজেন্সিগুলো কর্মী বাছাই, নথি যাচাই ও প্রেরণসংক্রান্ত সমস্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
G2G Plus কর্মসূচি মূলত এই MOU-এরই একটি বিস্তৃত রূপ, যেখানে উভয় সরকার সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকায় থেকে বেসরকারি এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই কাঠামোর আওতায়ই ৪ লাখ ৭২ হাজারের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
বৈধ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বহুমুখী মামলা
এই বিশাল কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অভিযোগ ওঠে যে সরকার নির্ধারিত ফি-র অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে এবং এজেন্সিগুলো 'সিন্ডিকেট' গঠন করে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অভিযোগের সূত্র ধরে যুক্ত হয় মানিলন্ডারিং ও মানব পাচারের মতো আরও গুরুতর আইনি অভিযোগ, যার ফলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা, বিএমইটি কর্মকর্তা এবং একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও পরিচালক মামলার আসামি হন।
মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন (MACC) এর তদন্ত
এই অভিযোগগুলো শুধু বাংলাদেশেই নয়, মালয়েশিয়াতেও তদন্তের আওতায় আসে। মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন — Malaysian Anti-Corruption Commission (MACC) — স্বতন্ত্রভাবে তদন্ত পরিচালনা করে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তদন্ত শেষে MACC বিষয়টিকে 'NFA' (No Further Action) হিসেবে ঘোষণা করে, এবং সেখানেও সিন্ডিকেট গঠন বা অর্থ পাচারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, যে প্রক্রিয়াটিকে অবৈধ বলা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়ার গন্তব্য দেশ মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাও কোনো অনিয়ম খুঁজে পায়নি।
বাংলাদেশে বারবার তদন্ত, বারবার একই ফলাফল
MACC-এর তদন্ত ছাড়াও বাংলাদেশে তিনটি পৃথক রাষ্ট্রীয় সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই একই অভিযোগ নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করেছে, এবং প্রতিটি তদন্তের পরিণতি একই — মূল অভিযোগগুলো প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
২০১৮–১৯ — MACC (মালয়েশিয়া)
মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশনের অ্যান্টি-করাপশন তদন্তে সিন্ডিকেট ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হয়।
২০২০ — দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
সিন্ডিকেট গঠন, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা, বিএমইটি কর্মকর্তা এবং ২০টিরও বেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত পরিচালনা করে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২২ নভেম্বর ২০২০ তারিখে স্মারক নং ০০.০১.০০০০.৫০০.৫০.০৯১.২০.৯৬ মারফত কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিসমাপ্ত করা হচ্ছে।
২০২৪–২৫ — অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)
দুদকের তদন্তে প্রমাণ না মেলার পরেও মানব পাচারের অভিযোগে সিআইডি পৃথকভাবে তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্ত শেষে সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে এবং আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া মিলিয়ে মোট চারটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পৃথকভাবে তদন্ত পরিচালনা করেছে। প্রতিটি তদন্তেই সিন্ডিকেট, মানব পাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের মূল অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তবুও বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এখনও বিভিন্ন মামলা ও হয়রানির মুখোমুখি রয়েছে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার পুরোপুরি সচল হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আইনি জটিলতা। যে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো দুই দেশের সরকারি চুক্তির আওতায় বৈধভাবে কর্মী পাঠিয়েছিল, তারা মামলা ও হয়রানির শিকার হওয়ায় নতুন করে কর্মী প্রেরণের প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ এই আইনি দীর্ঘসূত্রতায় যতদিন আটকে থাকবে, ততদিন নেপাল, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে থাকবে — এবং একবার হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
আইনি দীর্ঘসূত্রতার অবসান এখন সময়ের দাবি
সরকারি চুক্তির (MOU ও G2G Plus) আওতায় ৪ লাখ ৭২ হাজারের বেশি কর্মী প্রেরণের পর বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মালয়েশিয়ার MACC থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দুদক, সিআইডি ও ডিবি — কোনো তদন্তেই প্রমাণিত হয়নি। বারবার একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি এবং বারবার প্রমাণের অভাবে অভিযোগ খারিজ হওয়া সত্ত্বেও মামলা ও হয়রানি অব্যাহত থাকায় বৈধ শ্রমবাজার পরিচালনাকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বৃহত্তর স্বার্থে এই আইনি অচলাবস্থার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন। প্রমাণহীন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করে বৈধ রিক্রুটিং খাতকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে না পারলে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসবে।
Comments