| Loading weather...
Breaking News Breaking

মানব পাচারের প্রমাণ না থাকলেও চলছে মামলা - ভুক্তভোগী মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্ত সকল রিক্রুটিং এজেন্সি

১০৩ জনের বিরুদ্ধে আফিয়া ওভারসীজ এর মামলা সংক্রান্ত আইনি লড়াই বাংলাদেশের মালয়েশিয়া শ্রম করিডোরকে অচল করে দিয়েছে, যার ফলে লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান ও রেমিটেন্স আয় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আইনি লড়াইয়ে বিপর্যস্ত মালয়েশিয়া কর্মী প্রেরণ ও দেশের রেমিট্যান্স
আইনি লড়াইয়ে বিপর্যস্ত তালিকাভুক্ত সকল রিক্রুটিং এজেন্সি - সংকটে কর্মী প্রেরণ ও দেশের রেমিট্যান্স
১০৩
মোট আসামী
১০১
রিক্রুটিং এজেন্সি
৫২
চার্জশীটভুক্ত আসামী
৫১
অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামী

তদন্তের ধারাবাহিকতা

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ — পল্টন থানায় মামলা দায়ের

আফিয়া ওভারসিজ-এর স্বত্বাধিকারী আলতাব খান মালয়েশিয়া সরকারের তালিকাভুক্ত (BOESL ব্যতীত) সকল রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী এবং সাবেক সিনিয়র সচিব সহ মোট ১০৩ জনের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মামলা দায়ের করেন। পেনাল কোডের ৪০৬/৪২০/৩৮৫/৪২৭/৩৪ ধারায় বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, সংঘবদ্ধ পরিকল্পিত অপরাধ ও চাঁদাবাজি এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২-এর ৬/৭/৮/৯/১০ ধারায় মানব পাচারের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৫ জুলাই ২০২৫ — সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল

দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডি মানব পাচারের অভিযোগের সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না পেয়ে সকল আসামীর অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। একইসাথে, মিথ্যা মামলা দায়েরের কারণে বাদী আলতাব খানের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২-এর ১৫ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়।

৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ — বাদীর নারাজী আবেদন

তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মরত কোনো শ্রমিকের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকলেও বাদী আলতাব খান সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজী দরখাস্ত দাখিল করেন। দরখাস্তে তিনি অভিযোগ করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারকারী ও সাক্ষীদের যথাযথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ না করেই মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

১২ নভেম্বর ২০২৫ — মানব পাচার অভিযোগ পুনঃতদন্তের জন্য ডিবি মতিঝিলে প্রেরণ

মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নির্দেশে মানব পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের পুনঃতদন্তের আদেশদিয়ে ডিবি, মতিঝিল-কে অর্পণ করা হয়।

১২ নভেম্বর ২০২৫ — পেনাল কোডের উল্লেখিত অভিযোগ সমুহ পুনঃতদন্তের জন্য ডিবি সাইবার ক্রাইমে প্রেরণ

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সাব্বির ফয়েজের নির্দেশে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর পুনঃতদন্তের আদেশ দেন ও তদন্তভার ডিবি, সাইবার ক্রাইম বিভাগকে দেওয়া হয়।

৩০ নভেম্বর ২০২৫ — ১২ নং আসামীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান

মামলার ১২ নং আসামী, ইউনাইটেড এক্সপোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস.এম. রফিক, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় বাদীর পক্ষে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দিতে তিনি ১০ জন আসামীর নাম উল্লেখ করে বাকি আসামীদের সমন্বয়ে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট গঠন করে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন।

২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ — স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার

মাত্র ২৮ দিনের ব্যবধানে এস.এম. রফিক আদালতে ওই জবানবন্দি প্রত্যাহার করেন। প্রত্যাহার আবেদনে তিনি দাবি করেন, জবানবন্দিটি তিনি স্বেচ্ছায় দেননি। তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন খান (বিপি: ৭৮০৪০৯৯১৫০), অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও মাদক নিয়ন্ত্রণ টিম, গোয়েন্দা বিভাগ, ডিএমপি — তাকে ও তার পরিবারকে রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক ওই মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

২২ মে ২০২৬ – ডিবির চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও চার্জশীট দাখিল

পুনঃতদন্ত শেষে ডিবি জানায়, মানব পাচারের অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

  • চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মানব পাচারের অভিযোগ থেকে আসামীদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
  • প্রতারণাসহ পেনাল কোড সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারায় সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক সচিবসহ ৫২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করা হয় এবং অবশিষ্ট ৫১ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
১৪ জুন ২০২৬ — আদালতের চার্জশীট গ্রহন

ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কর্তৃক আদেশনামা জারি করা হয়। যার মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলকৃত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেছেন এবং ৫১ জন আসামীর বিরুদ্ধে বিচারার্থে অপরাধ আমলে নিয়েছেন। এছাড়া, ৫২ জন আসামীকে মামলার দায় হতে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়।

ক্ষতির ভার বহন করছে দেশ

দুটি পৃথক তদন্ত সংস্থা মানব পাচারের মূল অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। অথচ এই মামলার প্রায় দুই বছরের দীর্ঘ আইনি যাত্রা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কার্যত স্থবির করে রেখেছে। বৈধ ও সৎ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মামলার চাপে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় অপারগ হয়ে পড়েছে। একদিকে হাজারো কর্মপ্রত্যাশী মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান রেমিট্যান্স। এই আইনি অচলাবস্থার দ্রুত ও ন্যায়সম্মত নিষ্পত্তি না হলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ আরও গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হবে।

Comments